হজ্জের প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও আমল (পার্ট-২)


ড. মো: হাবিবুর রহমান

Published: 2018-07-25 19:24:31 BdST | Updated: 2018-11-13 08:32:16 BdST

 

(পার্ট-২)

হজ্জের দিনগুলির আমল :
মিনায় অবস্থান:
৮ জিলহজ্জ তারিখে মক্কা থেকে হজ্জের ইহরাম বাধা এবং মিনায় গমন:
 মক্কাবাসীরা এবং মক্কায় অবস্থানরত অন্যান্যরা যিল-হাজ্জ মাসের ৮ তারিখে অর্থাৎ তালবিয়ার দিন তাদের স্ব-স্ব অবস্থান থেকেই হজ্জের ইহরাম বাধবে। অতঃপর মিনায় গিয়ে সেখানে যোহর, আছর, মাগরিব, এশা এবং ফজরের সালাত ক্বছর করে আদায় করবে; জমা করে নয়। বর্তমানে হাজী সংখ্যা বেশী হওয়াতে ৭জিলহজ্জ রাত্রে হাজীসাহেবদের মিনাতে নিয়ে যায়।
 হজ্জে সালাত ক্বছর এবং জমা করে আদায়ের ক্ষেত্রে বহিরাগত এবং মক্কাবাসী হাজী সবাই সমান। কেননা যেসব মক্কাবাসী রাসূল (সা.) এর সাথে হজ্জ করেছিলেন তাঁদেরকে তিনি সালাত পূর্ণ করতে বলেননি। তারাও রাসূল (সা.) এর সাথে একসাথে ক্বছর করেছিলেন।
 আরাফার রাতে মিনায় রাত্রিযাপন করা মুস্তাহাব। এ রাতে কেউ যদি মিনায় না থাকে, তাহলে তার কোনো গোনাহ হবে না।

আরাফায় অবস্থান :
১. আরাফার দিবসে সূর্য উঠার পরে মিনা থেকে আরাফায় যাওয়া উত্তম। আরাফায় যাওয়ার সময় হাজীরা ‘আল্লাহু আকবার’ এবং তালবিয়া পড়তে পড়তে যাবে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, غَدَوْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مِنْ مِنًى إِلَى عَرَفَاتٍ مِنَّا الْمُلَبِّى وَمِنَّا الْمُكَبِّرُ “আমরা ভোরে রাসূল (সা.) এর সাথে মিনা থেকে আরাফায় গিয়েছিলাম; আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তালবিয়া পড়ছিলেন, আবার কেউ কেউ ‘আল্লাহু আকবার’ বলছিলেন।” (সহীহ মুসলিম)
২. আরাফায় পৌঁছে অবস্থান গ্রহণ করবে। আরাফায় অবস্থান হজ্জের একটি রুকন, যা ছেড়ে দিলে হজ্জই সম্পন্ন হবে না। রাসূল (সা.) বলেন, الْحَجُّ عَرَفَةُ ‘আরাফায় অবস্থানই হচ্ছে হজ্জ।’ (তিরমিযি ও নাসায়ী)
৩. আরাফার দিন সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থান করবে। সূর্যাস্তের পরে সেখান থেকে প্রস্থান করবে; সূর্যাস্তের আগে নয় (সহীহ মুসলিম)
৪. হাজীগণ আরাফায় যোহরের প্রথম ওয়াক্তে এক আযান ও দুই ইক্বামতে জমা-ক্বছর করে যোহর এবং আছরের সালাত আদায় করবে (সহীহ মুসলিম)
সালাতের পূর্বে ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি কর্তৃক জনগণের উদ্দেশ্যে খুৎবা দেওয়া উত্তম। এই খুৎবায় তিনি হজ্জের অবশিষ্ট বিধিবিধান এবং অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা রাখবেন (সহীহ মুসলিম)

৫. ক্বিবলামুখী হয়ে আরাফার ময়দানের যে কোনো স্থানে অবস্থান করলেই চলবে। এই মহান দিবসে বেশী বেশী করে তালবিয়া, দো‘আ ও যিকর-আযকার করতে হবে। দো‘আ করার সময় মহান আল্লাহ্র নিকট কাকুতি-মিনতি পেশ করতে হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাত উভয় যিন্দেগীর সার্বিক কল্যাণ প্রার্থনা করতে হবে। হাজীরা যাবতীয় পাপাচার থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহ্র নিকট খাটিঁ তওবার মাধ্যমে তাঁকে সন্তুষ্ট করবে।
৬. ইবাদতের উদ্দেশ্যে আরাফার ময়দানের অবস্থান হচ্ছে মুসলিমদের সর্ববৃহৎ মিলনমেলা। এই অবস্থানের মাধ্যমে একজন মুসলিম ক্বিয়ামত দিবসে হাশরের ময়দানে পূর্ব ও পরের সকল মানুষের সমাবেশের কথা স্মরণ করবে এবং সৎ আমল দ্বারা সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।
৭. আরাফায় অবস্থান এবং এই দিবসের ফযীলত বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন, مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللَّهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِى بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُولُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ “আরাফার দিন ব্যতীত অন্য কোন দিনে মহান আল্লাহ এতবেশী সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন না। তিনি এই দিন কাছাকাছি চলে আসেন এবং বান্দাদেরকে নিয়ে গর্ব করে ফেরেশতাম-লীকে বলেন, ওরা কি চায়?” (সহীহ মুসলিম)
আরাফার দিনে দো‘আ করার ফযীলত বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন, خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي: لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ “সর্বশ্রেষ্ঠ দো‘আ হচ্ছে আরাফার দিবসের দো‘আ। আমি এবং নবীগণ সর্বোত্তম যে দো‘আটি করেছি, তা হচ্ছে এই, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ “আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ব মা‘বূদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরীক নেই। যাবতীয় রাজত্ব তাঁরই এবং তাঁর জন্যই যাবতীয় প্রশংসা। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূনানে তিরমিযী)
আরাফায় দো‘আ করার সময় দুই হাত উঠিয়ে দো‘আ করার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, كُنْتُ رِدْفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَفَاتٍ فَرَفَعَ يَدَيْهِ يَدْعُو، فَمَالَتْ بِهِ نَاقَتُهُ فَسَقَطَ خِطَامُهَا، فَتَنَاوَلَ الْخِطَامَ بِإِحْدَى يَدَيْهِ وَهُوَ رَافِعٌ يَدَهُ الأُخْرَى “আরাফায় (উটের পিঠে) আমি রাসূল (সা.) এর পেছনে ছিলাম। তিনি দুই হাত উঠিয়ে দো‘আ করেন। তাঁর উটটি একটু ঝুঁকে পড়লে উটের লাগাম পড়ে যায়। অতঃপর তিনি এক হাত উত্তোলিত অবস্থায় অপর হাত দিয়ে লাগামটি উঠান।” (সূনানে নাসা‘ঈ)

মুযদালিফায় রাত্রি যাপন:
১. আরাফার দিন সূর্যাস্তের পর হাজীগণ পরস্পর পরস্পরকে কষ্ট না দিয়ে শান্তশিষ্টভাবে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হবে। মুযদালিফায় পৌঁছে সেখানে অবস্থান গ্রহণ করবে। হাজীদেরকে মুযদালিফা সীমানায় পৌঁছার বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।
২. মুযদালিফায় হাজীরা মাগরিবের সময় পৌঁছাক বা এশার সময় পৌঁছাক সেখানে অবস্থান গ্রহণের পর তাদের প্রথম কাজ হচ্ছে, এক আযান ও দুই ইক্বামতে মাগরিব এবং এশার সালাত জমা-ক্বছর করে আদায় করা।
৩. হাজীরা মুযদালিফাতে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করবে। অতএব, কেউ যদি মধ্যরাতের আগে মুযদালিফা ত্যাগ করে, তাহলে তাকে দম (دم) দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মধ্যরাতের পূর্বে ত্বওয়াফে ইফাদ্বা যেমন জায়েয নয়, তেমনি কংকর নিক্ষেপও জায়েয নয়। মুযদালিফার রাত্রির জন্য সালাত বা অন্য কোনো ইবাদত নির্দিষ্ট নেই। তবে বছরের অন্য রাত্রিতে একজন মুসলিম যেমন বিতর সালাত আদায় করে থাকে, এ রাতেও সে তা আদায় করতে পারে।
৪. ফজর উদয় হওয়ার পর প্রথম ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করবে। অতঃপর সকাল খুব পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত যিক্র ও দো‘আয় মশগূল থাকবে। রাসূল (সা.) এমনটি করেছেন। আর মহান আল্লাহ বলেন, فَإِذَا أَفَضْتُمْ مِنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ وَإِنْ كُنْتُمْ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الضَّالِّينَ “অতঃপর যখন ত্বওয়াফের জন্য আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশ‘আরে হারামের নিকটে আল্লাহ্র যিক্র কর। আর তাঁর যিক্র কর তেমনি করে, যেমন তোমাদেরকে তিনি হেদায়াত করেছেন। যদিও ইতোপূর্বে তোমরা ছিলে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা বাক্বারাহ-১৯৮)
এখানে ‘মাশ‘আরে হারাম’ বলতে মুযদালিফাকে বুঝানো হয়েছে। কেননা এটি হারাম এলাকার মধ্যে অবস্থিত।
৫. তবে দুর্বল নারী, শিশু এবং এজাতীয় হাজীরা শেষ রাতে মুযদালিফা থেকে মিনায় যেতে পারবে। কেননা নবী (সা.) তাদেরকে অনুমতি দিয়েছেন (সহীহ আল-বুখারী)
৬. হাজীগণ এখান থেকে কংকর কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে যান এটা ঠিক নাই। কারণ এখানে বেশী বেশী আমলে ব্যস্ত থাকাই হাজীর মুল কাজ। সময় সুযোগ বুঝে এখান থেকে অথবা পথিমধ্যে কংকর সংগ্রহ করা যায়।

কুরবানীর দিনের কাজসমূহ:
কুরবানীর দিন চারটি কাজ, যথাঃ (ক) জামরাতুল আক্বাবায় কংকর নিক্ষেপ করা, (খ) কুরবানীর পশু যবাই বা নাহর করা, (গ) মাথা মু-ন করা বা চুল ছেটে ফেলা এবং (ঘ) ত্বওয়াফে ইফাদ্বা করা এবং (ঙ) যে ব্যক্তি সা‘ঈ করেনি, তার জন্য এই ত্বওয়াফের পর সা‘ঈ করা। রাসূল (সা.) উক্ত ধারাবাহিকতা অনুযায়ীই কাজগুলি করেছেন। কেননা তিনি প্রথমে কংকর নিক্ষেপ করেছেন, অতঃপর কুরবানীর পশু যবেহ করেছেন, অতঃপর মাথা মু-ন করেছেন, অতঃপর ত্বওয়াফ করেছেন।
(ক) রাসূল (সা.) সকাল খুব পরিষ্কার হলে সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে মুযদালিফা ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে ফাদ্বল ইবনে আব্বাস (রা.) নবী (সা.) এর জন্য সাতটি কংকর কুড়িয়ে দেন, সকালে যেগুলি তিনি জামরাতুল আক্বাবায় নিক্ষেপ করেন। সূর্যোদয়ের পরে কংকর নিক্ষেপ করা উত্তম।
(খ) কুরবানীর পশু গরু বা ছাগল হলে যবেহ করতে হবে। স্বাভাবিক কুরবানীর পশু যেমন কমপক্ষে একটি ছাগল অথবা উট বা গরুর সাত ভাগের এক ভাগ হতে হবে, হজ্জের কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম বলবৎ থাকবে। যবেহ মিনা এবং মক্কায় সম্পন্ন হতে হবে। জাবের (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, مِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ، وَكُلُّ فِجَاجِ مَكَّةَ طَرِيقٌ وَمَنْحَرٌ “মিনার সম্পূর্ণ এলাকা কুরবানীর স্থান। অনুরূপভাবে মক্কার প্রত্যেকটি এলাকা চলার পথ এবং কুরবানীর স্থান।” (সূনান ইবনে মাজাহ)
কুরবানীর পশু উট হলে নাহরের দিনে (১০ই যিল-হজ্জ) এবং তাশরীক্বের তিন দিনে রাত বা দিনের বেলায় যে কোনো সময় তাকে নহর (উটের সামনের বাম পা বেঁধে এর গ-দেশে আঘাত করে রক্ত প্রবাহিত করা) করতে হবে।
(গ) কুরবানীর দিনের তৃতীয় কাজ হচ্ছে, মাথা মু-ন করা বা চুল ছেটে ফেলা।
(ঘ) কুরবানীর দিনের চতুর্থ কাজ হচ্ছে, ত্বওয়াফে ইফাদ্বা করা। এই ত্বওয়াফ হজ্জের রুকনসমূহের মধ্যে অন্যতম; এটি ব্যতীত হজ্জ পূর্ণ হবে না।

তাশরীক্বের দিনগুলিতে মিনায় রাত্রি যাপন:
১. সকল হাজী ১১ এবং ১২ তারিখ রাতে মিনায় রাত্রি যাপন করবে। যে ব্যক্তি তাড়াহুড়া করে চলে আসতে চায়, সে ১২ তারিখ অপরাহ্নে কংকর নিক্ষেপের পর সূর্যাস্তের আগেই মিনা ত্যাগ করবে। পক্ষান্তরে যে বিলম্ব করতে চায়, সে ১৩ তারিখ রাতেও মিনায় রাত্রিযাপন করবে এবং ১৩ তারিখ অপরাহ্নে কংকর নিক্ষেপের পর মিনা ত্যাগ করবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَعْدُودَاتٍ فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَنْ تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ لِمَنِ اتَّقَى “আর তোমরা নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে আল্লাহ্র যিক্র কর। অতঃপর যে ব্যক্তি প্রথম দুই দিনে তাড়াহুড়া করে চলে যাবে, তার জন্য কোন পাপ নেই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাড়াহুড়া না করে থেকে যাবে, তাঁর উপর কোনো পাপ নেই। অবশ্য যারা ভয় করে।” (সূরা আল-বাক্বারাহ ২০৩)
২. মিনায় দুই বা তিন রাত যাপন করা হজ্জের অন্যতম ওয়াজিব কাজ। কাজেই মিনাতে যে কয়দিন অবস্থান করবে রাতের শুরুর দিক থেকে হোক বা শেষের দিক থেকে হোক, হাজী জেগে থাকুক বা ঘুমিয়ে থাকুক রাতের বেশীর ভাগ সময় মিনায় কাটালেই সেটাকে মিনায় রাত্রিযাপন ধরা হবে।
৩. ১২ তারিখে তাড়াহুড়ো করে মিনা থেকে চলে আসার চাইতে ১৩ তারিখ পর্যন্ত বিলম্ব করাই উত্তম। কেননা নবী (সা.) তাড়াহুড়া না করে বিলম্বই করেছেন। এছাড়া বিলম্ব করলে কিছু অতিরিক্ত আমল করা যাবে এবং এর মাধ্যমে হাজী বেশী নেকী লাভ করতে পারবে।
৫. ১২ তারিখে কারো মিনায় থাকা অবস্থায় সূর্য ডুবে গেলে তাকে মিনাতেই রাত কাটাতে হবে এবং ১৩ তারিখ অপরাহ্নে কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলতেন, مَنْ غَرَبَتْ لَهُ الشَّمْسُ مِنْ أَوْسَطِ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ وَهُوَ بِمِنًى فَلاَ يَنْفِرَنَّ حَتَّى يَرْمِىَ الْجِمَارَ مِنَ الْغَدِ “তাশরীক্বের দিনগুলির মধ্যবর্তী দিনে কারো মিনায় থাকা অবস্থায় যদি সূর্য ডুবে যায়, তাহলে সে পরের দিন কংকর নিক্ষেপ না করা পর্যন্ত মিনা ত্যাগ করবে না।” (মালেক, মুওয়াত্ত্বা)

তাশরীক্বের দিনগুলিতে কংকর নিক্ষেপ:
কংকর নিক্ষেপের মূল কাহিনী হচ্ছে, শয়তান জামরাত এলাকার কয়েকটি স্থানে ইবরাহীম (আ.) এর সামনে আসলে তিনি তাকে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করেন।
১. কুরবানীর দিন পূর্বাহ্নে শুধুমাত্র জামরাতুল আক্বাবায় এবং তাশরীক্বের দিনগুলিতে অপরাহ্নে সবগুলি জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা হজ্জের ওয়াজিব আমলসমূহের অন্তর্ভুক্ত।
২. জামরাতসমূহে নিক্ষেপের কংকর কুড়ানোর নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। সেজন্য মুযদালিফা, মিনা বা মক্কা থেকে তা কুড়ানো যাবে। তাড়াহুড়া করে মিনা ত্যাগকারীদের জন্য ৪৯টি এবং বিলম্বকারীদের জন্য ৭০টি কংকর প্রয়োজন হয়। হাজী নিজে যেমন নিজের কংকর কুড়াতে পারে, তেমনি তার জন্য অন্য কেউও কুড়িয়ে দিতে পারে। অনুরূপভাবে কেউ কংকর বিক্রি করলে তা কিনে নেওয়াও জায়েয রয়েছে।
৩. কংকরসমূহ ছোলার দানার চেয়ে একটু বড় সাইজের হতে হবে; এর চেয়ে বড় হওয়া জায়েয নয়। কেননা এর চেয়ে বড় হলে তা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি হিসাবে বিবেচিত হবে। কংকর ব্যতীত কাঠ, মাটি, লোহা, কাঁচ, হাড় ইত্যাদির টুকরা দিয়ে নিক্ষেপ করা যাবে না।
৪. হাজীকে নিশ্চিত হতে হবে, তার নিক্ষিপ্ত কংকরটি নিক্ষেপের যথাস্থানে গিয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটি কংকর আলাদাভাবে নিক্ষেপ করতে হবে এবং প্রত্যেকটি কংকর নিক্ষেপের সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে। সবগুলি কংকর একসঙ্গে নিক্ষেপ করলে হবে না। অনুরূপভাবে কংকরগুলিকে নিক্ষেপের যথাস্থানে রেখে দিলেও হবে না। কেননা রেখে দেওয়া এবং নিক্ষেপ করা এককথা নয়।
৫. নাহরের দিনের (১০ই যিলহজ্জ এর) আইয়ামে তাশরীক্বের দিনগুলিতে প্রত্যেকদিন অপরাহ্নে কংকর নিক্ষেপ করতে হবে; এর পূর্বে নিক্ষেপ করা জায়েয নয়।
৬. তাশরীক্বের দিনগুলিতে হাজী সাহেব জামরাতগুলিতে ধারাবাহিকভাবে কংকর নিক্ষেপ করবে। প্রথম জামরাত দিয়ে আরম্ভ করবে; অতঃপর মধ্য জামরাত, এরপর জামরাতুল আক্বাবায় কংকর নিক্ষেপ করবে। এই ধারাবাহিকতার খেলাফ করা জায়েয নেই।
৭. হাজী সাহেব যে কোনো দিক থেকে কংকর নিক্ষেপ করতে পারবে। তবে মিনাকে ডান দিকে এবং মক্কাকে বাম দিকে রেখে কংকর নিক্ষেপ করা উত্তম।
৮. ছোট বাচ্চারা কংকর নিক্ষেপে সক্ষম না হলে তার পক্ষ থেকে নিক্ষেপ করে দেওয়া যাবে। অনুরূপভাবে অসুস্থতা, বার্ধক্য বা গর্ভধারণ সম্পর্কিত সমস্যার কারণেও একই বিধান বলবৎ থাকবে।

বিদায়ী ত্বওয়াফ:
১. হজ্জ শেষ করে মক্কা ত্যাগের সময় হাজীরা যে ত্বওয়াফ করে থাকে তাকে বিদায়ী ত্বওয়াফ বলে। এই ত্বওয়াফ হজ্জের অন্যতম একটি ওয়াজিব। ঋতুবতী এবং প্রসূতি অবস্থায় পতিত মহিলা ছাড়া অন্য কাউকে এই ত্বওয়াফ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
২. উমরাকারীর জন্য বিদায়ী ত্বওয়াফ ওয়াজিব নয়; বরং তার জন্য মুস্তাহাব বা উত্তম। কেননা বিদায়ী ত্বওয়াফ ওয়াজিব সাব্যস্তকারী সবগুলি হাদীস এসেছে হজ্জের ক্ষেত্রে। সুতরাং উমরা শেষে কেউ বিদায়ী ত্বওয়াফ না করেই যদি মক্কা ত্যাগ করে, তাহলে তার উপর ফিদ্ইয়া আবশ্যক হবে না।
৩. কোনো হাজী যদি মক্কা ত্যাগের সময় পর্যন্ত ত্বওয়াফে ইফাদ্বাকে বিলম্বিত করে এবং এই ত্বওয়াফ করেই মক্কা ত্যাগ করে, তাহলে এই ত্বওয়াফই তার জন্য যথেষ্ট হবে, তাকে আর বিদায়ী ত্বওয়াফ করতে হবে না। কেননা এক্ষেত্রে ত্বওয়াফে ইফাদ্বাই হচ্ছে তার জন্য বায়তুল্লাহ্র সর্বশেষ কাজ।
৪. বিদায়ী ত্বওয়াফ শেষে সামনের দিকে মুখ করে স্বাভাবিকভাবে মসজিদ থেকে বের হবে, কা‘বার দিকে মুখ করে পশ্চাৎগামী হয়ে বের হবে না।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত


১৫ বছরের কম বয়সী যে কেউ যদি টানা ৪০ দিন জামায়াতের সাথে ফজরের নামাজ আদা...

ইসলাম | 2017-10-14 10:37:41

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) এক ব্যক্তিকে...

ইসলাম | 2017-11-16 18:51:55

জীব জন্তু, সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। মহান আল্লাহ তায়লা যেমনি মানব ও জ্ব...

ইসলাম | 2017-09-29 09:29:06

‘নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া/ আম্মাগো লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া/কাঁ...

ইসলাম | 2017-10-01 09:27:40

হযরত উবাদাতা ইবনে সামিত (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা যদ...

ইসলাম | 2017-10-03 10:59:56

যরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন...

ইসলাম | 2017-10-12 20:30:54

সৌদি আরবের জেদ্দায় ৭৩টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত‘বাদশা আব্দুল আজিজ আল...

ইসলাম | 2017-10-14 21:31:12

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য ও গুরুত্ব আমরা অনেকেই জ...

ইসলাম | 2017-11-02 19:34:28